পৃথিবী বদলে গেছে। পৃথিবীর পরিবেশের গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। 2002 সালে উত্তরবঙ্গের সমতল অঞ্চলে গরমকালে তাপমাত্রা সর্বাধিক 33-35ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত থাকতো। সেই সময় উত্তরবঙ্গে আগস্ট সেপ্টেম্বর মাসেই বেশী গরম পড়তো।
![]() |
| Image by Rosy / Bad Homburg / Germany from Pixabay |
এখন 2024 সাল। কিছুদিন আগে মে মাসে উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু এলাকায় সর্বাধিক তাপমাত্রা হয়েছিলো 42ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেই সঙ্গে বাতাসে আদ্রর্তা 15% । এই অবস্থায় ঠোঁট থেকে গলা পর্যন্ত শুকিয়ে যায়। একসময় রাজস্থানে এই রকম আবহাওয়া থাকতো। এখন সেখানে 53ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা। দিল্লিতে এবছর তাপমাত্রা 50ডিগ্রি অতিক্রম করেছে। তাপমাত্রা হয়ত আরো বাড়বে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই গ্রীষ্মকালে পশ্চিম ভারতে সর্বাধিক 60ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অতিক্রম করবে।
কোথাও বৃষ্টির অভাবে খরা, আবার কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে বন্যা। সেই সাথে ঘুর্ণিঝড় এবং বজ্রপাত আছেই। আবহাওয়ার প্রতিকূলতার জন্যে হয়তো আগামীদিনে ফসল উৎপাদন কম হবে। স্বাভাবিক ভাবেই খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। জলবায়ুর ক্রমাগত পরিবর্তনের ফলে যাতে ভবিষ্যতে খাদ্যসংকটের সৃষ্টি না হয় সেজন্য "প্রতিকূল পরিবেশে উচ্চফলনশীল বীজ" নিয়ে গবেষণা করতে হবে।
বিভিন্ন সংবাদসূত্র থেকে পাওয়া তথ্য দেখে বোঝা যায় যে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে মানুষের কাজের ধরণ এবং কাজের সময় বদলে যাচ্ছে। শ্রমজীবি মানুষেরা এখন দিনের পরিবর্তে অধিক রাত পর্যন্ত জেগে কাজ করছেন। শ্রমজীবিদের কাজের সময়ের পরিবর্তন তাদের স্বাস্থ্যের ওপরে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে সে বিষয়ে বিশদে স্বাস্থ্য গবেষোণার প্রয়োজন।
আগামীদিনে শহর এবং মফস্বল এলাকাগুলিতে এসি মেশিনের ইনস্টলেশন সংখ্যা আরো বাড়বে। ভারতের অধিকাংশ শহরই অপরিকল্পিত এবং ঘনবসতি পূর্ণ। অত্যাধিক ঘনবসতি পূর্ণ এলাকায় একসঙ্গে অনেকগুলি এসি মেশিন চললে সেখানকার পরিবেশের তাপমাত্রা 2-5 ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়বেই। ফলে যে পরিবারগুলি যারা এতদিন টেবিল ফ্যান বা সিলিং ফ্যানের ভরসায় চলতেন তারা প্রায় নিরুপায় হয়েই এসি মেশিন বসাতে বাধ্য হবেন।
অত্যাধিক ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী চালানোর জন্যে আগামীদিনে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। অপ্রচলিত শক্তির যেমন সৌরবিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। এখন অনেকেই এসি ফ্রিজ চালানোর জন্য বাড়িতে সোলার প্যানেল বসাচ্ছেন। সোলার প্যনেল এবং ব্যাটারি শিল্পগুলি আগামীদিনে যথেষ্ট লাভজনক হবে।
মেট্রো শহরগুলিতে এসি বাস, ক্যাব, এসি লোকাল ট্রেনের চাহিদা বাড়বে। ছোট শহর এবং মফস্বল গুলিতে জন পরিবহণের সুবিধা কম থাকার জন্যে চার চাকার প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা আরো বাড়বে। এখন চার চাকার ছোট গাড়িতে এসির সুবিধা থাকার জন্যে অধিকাংশ মানুষ যাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেশী চলাফেরা করতে হয় তাদের বাইকের পরিবর্তে প্রাইভেট গাড়ি কেনার ঝোঁক বাড়বে। ছোট শহরে এসি ক্যাবের চাহিদা বাড়বে।
বিশ্বের উষ্ণায়ণ এবং মুল্যবৃদ্ধি সমানুপাতিক। পরিবেশের গড় তাপমাত্রা যত বাড়তে থাকবে তত আয়ের তুলনায় খরচ বাড়বে। মাত্রারিক্ত বাধ্যতামূলক খরচের মুল্যবৃদ্ধির কারণে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে যাবে। মাত্রারিক্ত বাধ্যতামূলক খরচের মধ্যে ইলেকট্রিক বিল, মোবাইল রিচার্জ, জলের বিল, গ্যাসের বিল, প্রাইভেট স্কুলের ফি, ওষুধের দাম, চিকিৎসার খরচ, মুদিখানা দোকান বা স্টোরের সামগ্রীর দাম প্রতি বছর বাড়তে থাকবে।
বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং তাপমাত্রার অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর মাইগ্রেশন অর্থবা বাসস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে। তাপমাত্রার অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে স্বাস্থ্য এবং স্বাচ্ছন্দের দিকে লক্ষ্য রেখে মানুষ তাদের বাসস্থান পরিবর্তন করবেন। পরিবেশে মাত্রারিক্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বিরাট মাপের ভুমিক্ষয়, মাত্রারিক্ত ভূমিকম্প, অতিরিক্ত বন্যা, কোনো স্থলভূমি নদী ভাঙ্গনের কারণে অথবা সমুদ্রের জলের লেভেল বেড়ে যাওয়া, স্থলভূমি স্থায়ীভাবে জলাভূমিতে পরিণত হওয়া ইত্যাদি কারণে কৃষিজমি এবং বাসস্থান ধ্বংস হবে। ফলে কৃষিকার্য কমে যাবে। উষ্ণায়নের কারনে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপরে নির্ভরশীল জীবিকা যেমন কাঠ সংগ্রহ, নদী সমুদ্র থেকে মাছ ধরা, মধু সংগ্রহ, পশুপালন ইত্যাদির সুযোগ অনেক কমে যাবে। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপরে প্রত্যেক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল পরিবারগুলির আয় কমতে থাকবে। ফলে নিম্ন আয়সম্পন্ন পরিবারগুলি বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের স্থায়ী বাসস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে।
পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ কি? এটা কি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ঘটনা? না মানুষের একান্ত বিজ্ঞান সাধনার ফলে তৈরী অধুনিক প্রযুক্তির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অথবা অপব্যাবহার? প্রশ্ন অনেক কিন্তু উত্তর কে দেবে? হয়ত ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই কেউ সঠিক উত্তর দেবে। কিন্তু যদি মানুষের পরিবর্তে সময় এবং পৃথিবীর পরিবেশ উত্তর দিতে শুরু করে তাহলে সেটা মানবজাতির জন্যে মোটেই সুখকর হবে না।

Comments
Post a Comment